শ্রাদ্ধ কটাক্ষ : পিতামাতার জীবদ্দশাতেই দায়িত্ব পালন করতে হয়, মৃত্যুর পর পিণ্ড দান ও শ্রাদ্ধ করা ভন্ডামি।

'শ্রাদ্ধ' শব্দটি এসেছে 'শ্রদ্ধা' থেকে। যে কাজের মূলে শ্রদ্ধা নেই, তা কেবলই একটি যান্ত্রিক প্রথা। জীবিত অবস্থায় যাঁদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা বা দায়িত্ববোধ দেখানো হয়নি, মৃত্যুর পর তাঁদের প্রতি দেখানো এই ভক্তি নিতান্তই অর্থহীন এবং আত্ম প্রবঞ্চনা। কিন্তু তাদের থেকে বড় প্রবঞ্চক সেই সকল ব্যক্তি যে বা যারা এই শ্রাদ্ধ কে কটাক্ষ করে। 

কারণ, যে ব্যক্তি নিজের মৃত মাতা-পিতা ও পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান পালন করছে, অন্ততঃ সে নিজের পূর্ব পুরুষদের পরলৌকিক কর্তব্য পালনে ব্রত আছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি এতটুকুও করছে না সে তো নির্লজ্য, দূরাচারি এবং কর্তব্য বিমুখ। আসুন জানি কেন: 


শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান পালন করা কর্তব্য, কেন?

 ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রাখুন এবং সাধুদের বানীকে নিজের জীবনে পালন করুন। কেউ কোনোদিন সনাতন ধর্মের ক্ষতি করতে পারবে না। একজন সাধু সন্ত বলেছেন, 

 "নিন্দক নিয়রে রাখিয়ে, আঙ্গন কুটি ছবায়। বিন পানী সাবুন বিনা, নির্মল করে সুভায়।"

 অর্থাৎ, নিন্দুককে সবসময় নিজের কাছে বা নিজের আঙিনায় রাখা উচিত। কারণ, নিন্দুকেরা বিনা সাবান ও জলেই আমাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে আমাদের স্বভাব ও চরিত্রকে পরিষ্কার করে দেয়।

তাই,  নিন্দুককে নিকটে  রাখুন এবং তোষামোদকারী থেকে সাবধান থাকুন। কারণ নিন্দুক ব্যাক্তির বানী হলো সেই ইন্ধন যেটা আপনাকে ধর্ম পথে সজাগ রাখে। আর তোষামোদকারীর বানী হলো, ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পায়েসের মত। কারণ, তার মিষ্টি বাক্যে আপনি ভুলকে ভালো, আর ভালোকে মন্দ বলে মনে করে নিশ্চিন্ত হয়ে একদিন নিজের সব কিছু হারাবেন। 

তাই যে বা যারাই শ্রাদ্ধ বা পরলৌকিক কর্তব্য পালন নিয়ে দিন রাত গালমন্দ করে চলেছে, তাদের কথাকে গুরুত্ব দিন। কিন্তু বিচার করার সময় শাস্ত্র অনুসারেই চলুন। কারণ, শাস্ত্র ধর্মের চোখ। শাস্ত্রের বানী যদি গরমিল মনে হয় তবে নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করুন। কিভাবে বিচার করবেন?

আপনি যদি লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন, প্রত্যেক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব, পবিত্র কিতাব ও মহাপুরুষদের আদর্শ পালন করেন। আপনি যদি একজন বৈদিক সনাতনী হন, তবে আপনি কেন পালন করবেন না? তাই বার্ষিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করা একান্তই কর্তব্য। 

 প্রত্যেক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে। আপনিও করবেন, নইলে যারা শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানকে নিয়ে সমালোচনা করে, কাল তারাই বলবে, বৈদিক সনাতনীরা নিজের মৃত পূর্ব পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার কোনো আচার নেই। ফলে আপনার ধর্মের অনাচার দেখিয়ে তারা ধর্মান্তরণ করবে। 

মৃত্যুর পর পিণ্ড দিলে কি সত্যিই পিতৃ পুরুষ তৃপ্ত হয়?

এই বিষয়টিকে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যেতে পারে: একটি হলো শাস্ত্রীয় বা পৌরাণিক বিশ্বাস, আর অন্যটি হলো দার্শনিক বা মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য।

১. শাস্ত্রীয় বা পৌরাণিক বিশ্বাস:

গরুড় পুরাণ এবং অন্যান্য হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মাকে এক নতুন যাত্রার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শাস্ত্র মতে, আত্মার এই যাত্রাপথে শক্তির প্রয়োজন হয়। পিণ্ডদানের মাধ্যমে যে অন্ন, তিল বা জল নিবেদন করা হয়, বিশ্বাস করা হয় যে তা সূক্ষ্মরূপে আত্মার কাছে পৌঁছায় এবং তাঁদের সেই যাত্রাপথকে সহজ করে। এটি তাঁদের 'প্রেতযোনি' থেকে মুক্ত হয়ে 'পিতৃলোকে' প্রবেশের পথ প্রশস্ত করে। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সন্তান যখন ভক্তিভরে এই পিণ্ডদান করে, তখন পিতৃপুরুষেরা তৃপ্ত হয়ে আশীর্বাদ করেন।

২. মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক তাৎপর্য:

যদি আমরা যুক্তিবাদী বা আধ্যাত্মিক দর্শনের দিক থেকে দেখি, তবে পিণ্ডদানের আরও কিছু গভীর অর্থ রয়েছে:

  • কৃতজ্ঞতা স্বীকার (পিতৃঋণ শোধ): আমাদের এই শরীর, বুদ্ধি ও অস্তিত্ব আমাদের পূর্বপুরুষদের দান। পিণ্ডদান বা শ্রাদ্ধ হলো মূলত তাঁদের এই অবদানের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক মাধ্যম।
  • মানসিক সান্ত্বনা ও মুক্তি: প্রিয়জনের মৃত্যুর পর মানুষের মনে যে শোক থাকে, শাস্ত্রীয় আচার বা পিণ্ডদানের মাধ্যমে পরিবার একটি মানসিক সান্ত্বনা বা 'Closure' পায়। মনে এই শান্তি আসে যে, "আমি আমার শেষ দায়িত্বটুকু পালন করেছি।"
  • প্রতীকী নিবেদন: ঈশ্বর বা আত্মারা তো আর জড়জগতের খাবার গ্রহণ করতে পারেন না। তাই এটি মূলত একটি প্রতীকী নিবেদন। এখানে মূল বিষয় খাবার নয়, বরং অন্তরের 'শ্রদ্ধা'।

এই সব ব্রাহ্মণের ব্যবসা:

যে কোনো অনুষ্ঠানে ঠাকুর পুরোহিতরা দান দক্ষিণ গ্রহণ করেন। এই দান দক্ষিনা দেওয়াকে নিন্দুকেরা ব্রাহ্মণদের ব্যবসা বা শোষণের পন্থা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। অথচ এই 'দক্ষিণা' কোনো সেবার নির্ধারিত মূল্য বা পারিশ্রমিক নয়, এটি হলো শ্রদ্ধার অর্ঘ্য। যাঁরা জাগতিক পেশা ছেড়ে নিজেদের জীবন বেদ, উপনিষদ ও পূজা-পার্বণ সংরক্ষণে উৎসর্গ করেছেন, সমাজ তাঁদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিত এই দক্ষিণার মাধ্যমে। এটি একটি পারস্পরিক আদান-প্রদানের ব্যবস্থা।

মানুষ যখন স্বজন হারিয়ে শোকে কাতর থাকে, তখন তারা অত্যন্ত দুর্বল থাকে। এই মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় অনেক পুরোহিত 'আত্মার কষ্ট হবে', 'প্রেতযোনি পাবে' বা 'নরকবাস হবে'—এমন ভয় দেখান। সাধারণ মানুষের শাস্ত্র সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তারা মনে করে যে, পুরোহিতকে প্রচুর অর্থ, গোদান বা শয্যাদান না করলে মৃত ব্যক্তি শান্তি পাবেন না। এটি পরোক্ষভাবে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ। সেই ক্ষেত্রে এমন ব্রাহ্মণকে দিয়ে ভবিষ্যতে কোনো কাজ না করানোই বিধান রয়েছে। সংহিতায় এদের পতিত ব্রাহ্মণ বা চন্ডাল বলা হয়েছে।

যে ব্যক্তি লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষের শোক ও মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে, সে কখনোই প্রকৃত ব্রাহ্মণ তো দূরের কথা মানুষ বলেই গণ্য হতে পারে না।

পরিশিষ্ট:

এখানে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতাকে কেবল আবেগ বা অন্ধবিশ্বাসের গণ্ডিতে না রেখে, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব এবং ধর্মরক্ষার মতো বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচকদের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে, নিজ ধর্মের আচারগুলো পালন করার যে আবশ্যকতা আমি তুলে ধরেছি, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আচার বা প্রথা ভুলে গেলে একটি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা ধর্মান্তরণের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন